কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ এ ১২:৫৮ PM

গ্রাম আদালতের কার্যক্রম

কন্টেন্ট: পাতা

Village Court Act, 2006 (সংশোধিত ২০১৩) এই আইনটি গ্রামীণ এলাকার ছোটখাটো বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি কাঠামো সরবরাহ করে, যার উদ্দেশ্য হলো দ্রুত, সহজলভ্য এবং কম খরচে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।

১. গ্রাম আদালত গঠন (ধারা ৪):

  • সদস্য সংখ্যা: প্রতিটি গ্রাম আদালত ৫ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হয়।

  • চেয়ারম্যান: সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। যদি চেয়ারম্যান অনুপস্থিত থাকেন বা আদালতে অংশ নিতে না পারেন, তাহলে ইউনিয়ন পরিষদের অন্য কোনো সদস্যকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত করা যেতে পারে।

  • পক্ষগণের প্রতিনিধি: আবেদনকারী পক্ষ ২ জন সদস্য মনোনীত করেন এবং বিবাদী পক্ষ ২ জন সদস্য মনোনীত করেন। এই ৫ জন সদস্যের মধ্যে ১ জন চেয়ারম্যান এবং বাকি ৪ জন উভয় পক্ষের মনোনীত প্রতিনিধি।

  • যোগ্যতা: মনোনীত সদস্যদের অবশ্যই সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের ভোটার হতে হবে এবং তাদের কোনো ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়া যাবে না।

২. এখতিয়ার (ধারা ৫):
গ্রাম আদালতের এখতিয়ার ফৌজদারি ও দেওয়ানি উভয় প্রকারের বিরোধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তবে এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

  • ফৌজদারি এখতিয়ার (তফসিল-১):

    • ছোটখাটো ফৌজদারি অপরাধ, যেমন – চুরি, মারামারি, আঘাত, ফসল বা সম্পত্তি নষ্ট করা, গৃহপালিত পশুর ক্ষতি ইত্যাদি।

    • সর্বোচ্চ ২৫,০০০ টাকা জরিমানা আরোপের ক্ষমতা।

  • দেওয়ানি এখতিয়ার (তফসিল-২):

    • জমিজমা সংক্রান্ত ছোটখাটো বিরোধ (যেমন – সীমানা বিরোধ, ফসলের ক্ষতি, অবৈধ দখল)।

    • ঋণ বা চুক্তিভঙ্গ সংক্রান্ত বিরোধ।

    • পারিবারিক বিরোধ (যেমন – দেনমোহর, ভরণপোষণ, তালাক সংক্রান্ত কিছু বিষয়)।

    • ক্ষতিপূরণ দাবি সংক্রান্ত বিরোধ।

    • সর্বোচ্চ ৭৫,০০০ টাকা মূল্যমানের বিরোধ নিষ্পত্তি করার ক্ষমতা (২০১৩ সালের সংশোধনী অনুযায়ী)। এর বেশি মূল্যমানের বিরোধ গ্রাম আদালতের এখতিয়ারবহির্ভূত।

৩. আবেদন দাখিল (ধারা ৬):

  • আবেদন: যে কোনো ব্যক্তি গ্রাম আদালতের এখতিয়ারাধীন কোনো বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নিকট লিখিত আবেদন দাখিল করতে পারেন।

  • ফি: আবেদনের সাথে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ফি জমা দিতে হয়।

  • আবেদনের বিষয়বস্তু: আবেদনে আবেদনকারীর নাম-ঠিকানা, বিবাদীর নাম-ঠিকানা, বিরোধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ, দাবিকৃত প্রতিকার এবং সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি উল্লেখ করতে হয়।

  • সময়সীমা: ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে ঘটনার ৩০ দিনের মধ্যে এবং দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে কারণ উদ্ভব হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে আবেদন করতে হয়। তবে যৌক্তিক কারণে চেয়ারম্যান সময়সীমা বাড়াতে পারেন।

৪. নোটিশ জারি ও জবাব দাখিল (ধারা ৭):

  • নোটিশ: আবেদন পাওয়ার পর গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান বিবাদী পক্ষকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লিখিত জবাব দাখিল করার জন্য নোটিশ জারি করেন।

  • জবাব: বিবাদী পক্ষ নোটিশ পাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের বক্তব্য বা জবাব আদালতে উপস্থাপন করে।

৫. গ্রাম আদালত পরিচালনা (ধারা ৮-১১):

  • আদালত গঠন: উভয় পক্ষের মনোনীত সদস্যদের নিয়ে গ্রাম আদালত গঠিত হয়।

  • শুনানি: উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা হয়, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সাক্ষী গ্রহণ করা হয় এবং প্রমাণাদি পর্যালোচনা করা হয়। আদালত লিখিত সাক্ষ্য এবং মৌখিক সাক্ষ্য উভয়ই গ্রহণ করতে পারে।

  • সমাধানের চেষ্টা: আদালত প্রথমে আপস বা মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করে। এটি সম্ভব না হলে, রায় প্রদান করা হয়।

  • রায় প্রদান: সকল তথ্য ও প্রমাণাদি পর্যালোচনা শেষে আদালত সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে রায় প্রদান করে। রায় লিখিত আকারে প্রদান করা হয় এবং উভয় পক্ষকে তা জানানো হয়। যদি রায় ৩-২ বা ৪-১ ভোটে হয়, তাহলে চেয়ারম্যানের ভোট निर्णायक হয়।

  • চেয়ারম্যানের ক্ষমতা: চেয়ারম্যান গ্রাম আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করেন এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখেন।

৬. রায় কার্যকরীকরণ (ধারা ১২-১৪):

  • রায় মানা: রায় প্রদানের পর উভয় পক্ষই রায় মানতে বাধ্য।

  • অমান্য করার ফলাফল: যদি কোনো পক্ষ গ্রাম আদালতের রায় অমান্য করে, তবে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান স্থানীয় এখতিয়ার সম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত


  • (ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে) বা দেওয়ানি আদালতে (দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে) রায় কার্যকর করার জন্য আবেদন করতে পারেন।

  • ডিক্রি হিসেবে কার্যকর: গ্রাম আদালতের রায় সংশ্লিষ্ট আদালত কর্তৃক ডিক্রি হিসেবে কার্যকর করা হয়, অর্থাৎ প্রচলিত আদালতের রায়ের মতোই এটি কার্যকর করার ক্ষমতা থাকে।

৭. আপিল (ধারা ১৫):

  • আপিলের সুযোগ: গ্রাম আদালতের রায়ে যদি কোনো পক্ষ অসন্তুষ্ট হয়, তবে রায়ের ৩০ দিনের মধ্যে তারা আপিল করতে পারে।

  • আপিল কর্তৃপক্ষ:

    • ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে: সংশ্লিষ্ট জজ আদালতের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট।

    • দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে: সিনিয়র সহকারী জজ বা সমমর্যাদার দেওয়ানি আদালত।

  • আপিল নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া: আপিল আদালত গ্রাম আদালতের নথি পর্যালোচনা করে এবং প্রয়োজনবোধে উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আপিলের নিষ্পত্তি করে। আপিল আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

৮. রেকর্ড সংরক্ষণ (ধারা ১৬):
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গ্রাম আদালতের সকল কার্যক্রম, আবেদন, নোটিশ, রায় এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র যথাযথভাবে সংরক্ষণ করবেন।

৯. সীমাবদ্ধতা ও বিধিবিধান (ধারা ১৭-২০):

  • মামলা স্থানান্তর: গ্রাম আদালত যখন দেখে যে তাদের এখতিয়ারের বাইরে কোনো মামলা এসেছে, তখন তারা সেই মামলাটি উপযুক্ত আদালতে স্থানান্তরের নির্দেশ দিতে পারে।

  • আইনের প্রাধান্য: এই আইনের অধীনে গ্রাম আদালত কর্তৃক গৃহীত কোনো পদক্ষেপ অন্য কোনো প্রচলিত আইনের সাথে সাংঘর্ষিক হলে, গ্রাম আদালত আইনই প্রাধান্য পাবে।

  • বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা: সরকার এই আইন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিধি প্রণয়ন করতে পারে।

গ্রাম আদালতের ভূমিকা ও গুরুত্ব:
Village Court Act, 2006 (সংশোধিত ২০১৩) এর মাধ্যমে গ্রাম আদালত গ্রামীণ বিচার ব্যবস্থায় একটি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে। এটি স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত ও সস্তায় বিচার নিশ্চিত করে,

প্রচলিত আদালতের উপর মামলার চাপ কমায় এবং গ্রামীণ সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন